Select Page

লিভারপুলে এনফিল্ডের ডায়েরি

লিভারপুলে এনফিল্ডের ডায়েরি

ফুটবল প্রেমিক হিসেবে ইংল্যান্ডে আসার আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে করেই হোক লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের একটা ম্যাচ দেখবো। সেই জেরাডদের সময় থেকে লিভারপুলের খেলা ভালো লাগতো, এরপর ক্লপ এসে তো গত কয়েক বছরে লিভারপুলের খেলার মান অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। যাই হোক ইংল্যান্ডে আসার পর অনলাইনে টিকিট খুঁজতে গিয়ে তো ছক্ষু চড়ক গাছ! প্রথমে ঠিক করি এনফিল্ডে চেলসি-লিভারপুল ম্যাচ দেখবো কিন্তু অনলাইনে ঢুঁ দিয়ে দেখি ঐ হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের টিকিটের সর্বনিম্ন দাম ১২২৫ পাউন্ড! বাংলাদেশী মুদ্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার মত! বড় ম্যাচ দেখার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে এবার ছোট ম্যাচের টিকিট খোঁজার পালা। অবশেষে ২১২ পাউন্ডে এনফিল্ডে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের লিভারপুল- নাপোলি ম্যাচের টিকিট পেয়ে গেলাম। আমার এক বিসিএস ব্যাচমেট এর সাথে বসে অনলাইনে টিকিট কাটার সময় কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলাম, ভুয়া ওয়েবসাইটের পাল্লায় পড়ে এতগুলো টাকা হারাই কিনা। অবশেষে ওয়েবসাইটে রেটিং এবং ইতিবাচক রিভিউ দেখে মনে সাহস সঞ্চয় করে অনলাইনে টিকিট কেটে ফেলি, যদিও ম্যাচের আগ মুহূর্তে টিকিট হাতে পাওয়া পর্যন্ত কিছুটা ভয়ে ছিলাম।

২৭ নভেম্বর থেকে বাসযোগে লিভারপুলের দিকে যাত্রা শুরু করি। ইংল্যান্ডে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাস ভ্রমণ সবচেয়ে সস্তা, এখানে ট্রেন ভ্রমণে বাসের তুলনায় কখনো দেড়গুণ কিংবা দুইগুন বেশি খরচ হয়। আরেকটি ব্যাপার হল এখানে বাস বা ট্রেন যাত্রার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন ভাড়া নেই। ভাড়া নির্ধারিত হয় সময় এবং চাহিদার উপর ভিত্তি করে। আপনি যত আগে টিকিট কাটবেন তত কম টাকা লাগবে। অন্যদিকে রিটার্ন টিকিট কাটলেও ভাড়া অনেক কম পড়ে। তাই নিম্নবিত্তদের প্রধান ভরসার জায়গা বাস ভ্রমণ, যেটি ট্রেনের মত অতটা আরামদায়ক নয়। এখানে বাস ভ্রমণের সুবিধা হল বাসেও ট্রেনের মত টয়লেট সুবিধা আছে, তাই যাত্রাপথে ছোটবড় কাজ নিয়ে কোন চিন্তা থাকেনা। আমাদের বাস প্রায় ৪০ মিনিট পরে যাত্রা শুরু করলো, যেটি ইংল্যান্ডে আসার পর বিরল অভিজ্ঞতা।

এখানে এসে মোটামুটি কয়েকটি জায়গা ঘোরার সুবাদে বাসে কিংবা ট্রেনে উঠলে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করি। জানালায় চোখ রাখতে খুব একটা টানে না, কারণ ইংল্যান্ডের শহর এবং প্রকৃতির মাঝে বৈচিত্রময়তার অবয়বটি খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই ঝাঁ চকচকে হাইওয়ে, একই ডিজাইনের শহুরে ঘরবাড়ি, হাইওয়ের পাশে ফেলে রাখা বিস্তীর্ণ হলুদ কিংবা সবুজ ঘাসের প্রান্তর, কখনো সারিবদ্ধ আবার কখনো এলোমেলো গাছপালার সমাহার, মাঝেমধ্যে উঁচুনিচু পাহাড়ি প্রান্তর, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা ছোট ছোট জলধারা, পাহাড়ের পাদদেশে ছোট ছোট ঘর, এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকা প্রাইভেট কার। গাছগুলোর মাঝে ভিন্নতা নেই বললেই চলে। আর একটি অবাক করা বিষয় লক্ষ্য করেছি সেটি হল ইংল্যান্ডে ফলবতী গাছ চোখেই পড়ে না, সেদিক দিয়ে ভাবলে আমরা অনেক ভাগ্যবান, কারণ আমাদের দেশে প্রকৃতি অকৃপণ হাতে ফলের গাছ রোপণ করেছেন তার বৈচিত্র্যময়তাকে সাথে নিয়ে।

এখানে খুব বেশি ট্র্যাফিক জ্যাম নেই, তবে বিকেল সাড়ে চারটের পরের সময়টাকে রাশ আওয়ার বলে। ঐ সময় শহরে প্রবেশের আগে থেকেই কিছুটা জ্যাম পাওয়া যায়। জ্যামে পড়লেই ভয় লাগছিল নির্ধারিত সময়ের আগে স্টেডিয়ামে পৌঁছাতে পারব কিনা। লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আসার পর জ্যামে পড়ে আমরা ড্রাইভারকে অনুরোধ করলাম, আমাদেরকে বাস থেকে নামিয়ে দিতে পারবে কিনা। সে শুরুতেই না বলে দিলে আমরা আরেকবার অনুরোধ করতেই সে খানিকটা রেগে গেল। পরে শান্ত স্বরে আমাদেরকে বুঝিয়ে বলল, ইংল্যান্ডে নির্দিষ্ট স্টেশনে ছাড়া বাস থেকে মানুষ ওঠানো এবং নামানোর কোন নিয়ম নেই। এটি করলেই বাস স্টেশনে পৌঁছানোর পূর্বেই সিসি টিভিতে ফুটেজ দেখে হাইওয়ে পুলিশ ড্রাইভারের নামে জরিমানার কাগজ পাঠিয়ে দিবে। এই জরিমানার ব্যবস্থা এবং কঠোর আইনের প্রয়োগের কারণেই এখানে শৃঙ্খলা অনেক বেশি, তাই চাইলেও কোন ড্রাইভার নির্ধারিত গতির ওপরে গাড়ি চালাতে পারে না, ফলে এখানে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক কম। যাই হোক জ্যাম পেরিয়ে আমরা ঠিক সময়ে লিভারপুল বাস স্টেশনে নামলাম। স্টেশন থেকে এনফিল্ডের দূরত্ব আড়াই কিলোমিটার মত হবে, তখনো ম্যাচ শুরু হতে ঘণ্টা দুয়েক বাকি। আমরা অগত্যা উবার ডাকলাম, কিন্তু এবার প্রাইম টাইমের পাল্লায় পড়লাম। শহরের বড় অংশের মানুষের গন্তব্য তখন এনফিল্ড। ফলে ৫ পাউন্ড এর উবার ভাড়া ৩০ পাউন্ড এ পৌঁছে গেছে। অগত্যা মন খারাপ করে উবারে উঠে বসলাম।

উবার চালক ছেলেটির বাড়ি রোমানিয়া, ছেলেটি বয়সে তরুণ এবং অত্যন্ত সপ্রতিভ। আমাদের সাথে আলাপকালে সে বলে যে, ইংল্যান্ডে আসার পর তার উপলব্ধি হয়েছে যে ইংল্যান্ডের তুলনায় রোমানিয়া কত গরীব! ওর কথা শুনে আমরা দুজন হেসে দিলাম। ছেলেটিও লিভারপুলের ফ্যান, জিজ্ঞেস করলাম ও মাঠে গিয়ে খেলা দেখে কিনা? প্রতি উত্তরে বলল, টিকিটের দাম অনেক বেশি ফলে ও নিজের টাকায় খেলা দেখতে মাঠে পা বাড়ায় না, তবে একটা সুবিধে হল, ওর গার্লফ্রেন্ড এর লিভারপুল ক্লাবের মেম্বারশিপ কার্ড আছে। ফলে ওর গার্লফ্রেন্ড যেদিন খেলা দেখতে না যায় সেদিন ও সুযোগটা গ্রহণ করে। আমরা ওর কথা শুনে হাসতে হাসতে বলি ভাই তুমি পারফেক্ট গার্লফ্রেন্ড বেছে নিয়েছ।

অবশেষে জ্যাম পেরিয়ে আমরা টিকিট সংগ্রহের নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে গেলাম। আসলে ইংল্যান্ডে ফুটবল ম্যাচের টিকিট নিয়ে এক অলিখিত জুয়া চলে। ক্লাব অন্তপ্রাণ সমর্থকরা নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে ক্লাবের মেম্বার হিসেবে নিবন্ধিত হয় এবং একটি করে মেম্বারশিপ কার্ড পায়। মেম্বারশিপ কার্ড থাকলে একজন সমর্থক পুরো সিজনের সবকয়টি ম্যাচের টিকিট অনেক কম দামে কিনতে পারে। তবে ক্লাবের মাথায়ও ব্যবসায়িক বুদ্ধি কম না। ওরা হাই ভোল্টেজ ম্যাচের টিকিটগুলোর দাম অনেক বেশি রাখে। ফলে সব ম্যাচের টিকিটের দাম সমান হয় না। মেম্বাররা সিজন টিকিট কিনে এবার জুয়া শুরু করে। ওরা অনলাইনে চড়া দামে টিকিট বিক্রি করে। অনলাইনে টিকিট বিক্রির বিভিন্ন ওয়েবসাইট আছে। যার কাছে টিকিট আছে সে মাঠের সিট নম্বর সহ ওয়েবসাইটে টিকিট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয় এবং টিকিট বিক্রির একটা অংশ ঐ ওয়েবসাইট এর স্বত্বাধিকারীও পায়। ফলে এখানে কয়েক পক্ষ জড়িত থাকে। অনলাইনে টিকিট কেনার সময় রেটিং এবং ফিডব্যাক দেখে নেয়া খুব জরুরী। ভালভাবে পরখ করে না নিলে ভুয়া ওয়েবসাইটের পাল্লায় পড়ে টাকা খোয়ানোর সম্ভাবনা সমূহ। আর তাই ডেবিট কার্ড থেকে এইসব লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অনেক সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে। যাই হোক টিকিট হাতে পাওয়ার পর যখন দেখলাম মাত্র ৯ পাউন্ড এর টিকিট ২১২ পাউন্ড দিয়ে কিনেছি তখন ক্ষণিকের জন্য মনটা খারাপ হয়েছিল। হাই ভোল্টেজ ম্যাচে এই টিকিটের দাম সাড়ে তিন হাজার পাউন্ড পর্যন্ত উঠে যায়, এটা ভেবে মনটাকে একটু সান্ত্বনা দিলাম।

এনফিল্ডের আশেপাশে প্রচুর পাব ও বারের দেখা মেলে। পাব ও বারের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে, সেটি হল পাবে শুধুমাত্র এলকোহলিক ও কোমল পানীয় পাওয়া যায়। অন্যদিকে বারে উভয় প্রকারের পানীয়ের সাথে ফাস্টফুডের সরবরাহ থাকে। এখানে ম্যাচের দিন প্রচণ্ড ভিড় থাকে, ফলে চেয়ার-টেবিলে বসে গ্লাস হাতে বড় পর্দায় খেলা দেখতে চাইলে আগে থেকে বুকিং দিতে হয়। খরচ খুব বেশি না দুই থেকে পাঁচ পাউন্ড এর আশেপাশেই থাকে। ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই পাব ও বারগুলো লিভারপুল সমর্থকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। সবার গায়ে লিভারপুলের জার্সি, গলায় ক্লাবের মাফলার, হাতে গ্লাস ভর্তি বিয়ার। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের বারে খেলা দেখে উপলব্ধি করেছি যে এরা বিয়ারটা আমাদের দেশে গরমকালে বাসায় তৈরি উৎকৃষ্ট মানের শরবতের চেয়ে অনেক ভালো খায় এবং সেটি খুব ভক্তি সহকারে। নিজের ফেভারিট দলের খেলার দিন ৯০ মিনিটে মোটামুটি চার-পাঁচ গ্লাস বিয়ার অবলীলায় পান করে থাকে। নিজের দল যদি গোল করে তাহলে অতি আবেগে ঢক ঢক করে এক গ্লাস শেষ করে সাথে সাথে আরেক গ্লাস অর্ডার দেয়। বিয়ারের দামও নেহায়েত কম নয়। নামী ব্র্যান্ডের এক গ্লাস বিয়ারের দাম সাড়ে চার পাউন্ড মত। অর্থাৎ এক ম্যাচে অনেকেই ২৫ পাউন্ড এর বিয়ার পান করে ফেলে অবলীলায়! তাইতো বলা হয় ফুটবল আর বিয়ার হল ব্রিটিশদের জীবনের অন্যতম প্রিয় দুই অনুষঙ্গ।

বার থেকে বেরিয়ে এবার মূল রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছি আমরা এনফিল্ডের দিকে। রাস্তার দুইপাশ জুড়ে লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের জার্সি, মাফলার সহ অন্যান্য জিনিসের বিকিকিনি চলছে পুরো দমে। কেউ আবার রাস্তার পাশে অস্থায়ীভাবে আমাদের দেশের হকারদের মত ছোট ছোট দোকান সাজিয়ে বসেছে। ভেবেছিলাম লিভারপুলের লাল জার্সি পরে মাঠে ঢুকবো, কিন্তু জার্সির চড়া দাম দেখে আর ডেবিট কার্ডে হাত দিতে ইচ্ছে করলো না। ক্লাব কিটসের পাশাপাশি প্রচুর খাবারের দোকান। মুলত ফাস্ট ফুডের দোকানই বেশি। মাঠের ভেতরে খাবার নেয়ার অনুমতি নেই বলে সবাই মাঠে ঢোকার আগে নাস্তা করে নেয়। আমরাও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে উদরপূর্তি করে মাঠের দিকে রওনা দিলাম। স্টেডিয়ামের চারপাশ জুড়ে নিরাপত্তা কর্মীদের সরব উপস্থিতি। আমরা আমাদের স্ট্যান্ড কোন দিকে সেটি অনুমান করতে পারছিলাম না। অগত্যা এক লেডি পুলিশ অফিসারকে জিজ্ঞেস করতেই সে হাসিমুখে আমাদের গন্তব্য দেখিয়ে দিল। আমরা ধন্যবাদ দিয়ে সামনে এগিয়ে চললাম।

ইংল্যান্ডে আসার পর প্রথমেই কয়েকটি সামাজিক রীতি আয়ত্ত করে নিতে হয়। সেটি হল হাই, হ্যালো, থ্যাংকস, ওয়েলাকাম, নাইস টু মিট ইউ, হ্যাভ এ গুড ডে ইত্যাদি। এর বাইরে আরেকটি রীতি হল, আপনি যদি দরজা খুলে আগে বের হন তাহলে আপনাকে দরজার হাতল টেনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আপনার পেছনের জন বেরিয়ে যাওয়ার পর আপনি বের হবেন। যাওয়ার সময় ওরা আপনাকে হাসি মুখে থ্যাংক ইউ বলবে আর প্রতি উত্তরে আপনিও হাসিমুখে ওয়েলকাম বলবেন। এদের প্রত্যেকটি কাজে এই হাসিমুখের অভিব্যক্তি আমাকে খুবই আকৃষ্ট করে। এই ম্যানারিজম ব্রিটিশদের একটা বিশেষ ঐতিহ্যের পর্যায়ে পড়ে। তাইতো কলকাতা শহরে ব্রিটিশদের দেখে বড় হওয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডে এসে এখানকার অধিবাসীদের আচরণ এবং ভারতবর্ষে থাকা ব্রিটিশদের আচরণের গুণগত পার্থক্য দেখে রীতিমত বিস্মিত হয়েছিলেন। তারপর কিছুদিন থাকার পর উনি জানতে পারেন যে, রাগী, বদমেজাজি এবং কুটিল মানুষগুলোকে বেছে বেছে ভারতবর্ষে পাঠানো হত ঠিকঠাক শাসন এবং শোষণ করার জন্য। এরা বাইরে গিয়ে উদ্ধত আচরণ করলেও, নিজেদের সমাজে ঠিক উল্টো মূল্যবোধের পরিচর্যা করে চলেছে। ফলে এখানে বাইরে থেকে যেই আসুক এদের ভদ্রতা এবং বিনয় দেখে সে মুগ্ধ হবেই। চলতি পথে ইংল্যান্ডের আরেকটি বিষয় ভালো লেগেছে, সেটি হল পুলিশের সাহায্য করার মনোভাব। আপনি বিপদে পড়লে আপনার সবচেয়ে ভরসার জায়গা পুলিশ। পুলিশের চমৎকার আচরণ এবং সাহায্য করার মনোভাব দেখে আপনি বিস্মিত না হয়ে পারবেন না।

পুলিশ অফিসারের কথামত আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের স্ট্যান্ডের দিকে। স্টেডিয়ামের সাথেই অনেকটা জায়গাজুড়ে ফ্যান পার্ক গড়ে তুলেছে। ফ্যান পার্কের স্টেজে চমৎকার আলোকসজ্জা করা এবং তার সাথেই বড় পর্দার ব্যবস্থা। ফ্যান পার্কের স্টেজে দেখলাম সঙ্গীতের লাইভ শো হচ্ছে এবং আমুদে সমর্থকরা খেলা শুরুর আগে সঙ্গীতের মূর্ছনায় মেতে উঠেছে। লিভারপুলের যেসকল সমর্থক টিকিট কাটতে পারে না, তাদের জন্য স্টেডিয়ামের বাইরে ক্লাবের এই চমৎকার আয়োজন ক্লাব অন্তপ্রান সমর্থকদের সাথে ক্লাবের আত্মিক বন্ধনটা আরও সুদৃঢ় করে। কারণ এই খ্যাপাটে ফুটবল পাগল দর্শকরাই হল ক্লাবের অক্সিজেন। ফ্যান পার্ক পেরিয়ে আমরা এনফিল্ডের মূল প্রবেশ পথের সামনে গেলাম, যেখানে সোনালী অক্ষরে জ্বলজ্বল করে শোভা বর্ধন করছে লিভারপুল ক্লাবের জাদুকরী স্লোগান YOU’LL NEVER WALK ALONE. গেট পেরিয়ে চেকিং শেষে চলমান লিফটে চড়ে সাত তলায় ওঠার পর এনফিল্ডের লাল-সবুজের ফুটবল রাজ্যে প্রবেশের পর বুঝতে পারলাম ক্লাবের স্লোগানের আসল মাহাত্ম।
সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের গতিময় এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় ফুটবলের একজন একান্ত অনুসারী হিসেবে এনফিল্ডের লাল-সবুজের মায়ার জগতে প্রবেশ করাটা ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য। এ এক অনির্বচনীয় অনুভূতি। একেবারে মেইন স্ট্যান্ড থেকে পুরো মাঠের ছবিটা চমৎকার ভাবে দেখা যায়। এনফিল্ডের চারিদিকে লালের ছোঁয়া, পুরো গ্যালারি থেকে শুরু করে প্রতিটা সিট সবই লালের আবেশে আবেশিত। সাত তলা সমান উঁচুতে পাওয়া সিটের সামনে দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে তাকাতেই মনে হয় যেন লাল সমুদ্রের মাঝে সবুজের আবাহনে ফুটবলের নির্যাস মন্থনে আমরা হাজির হয়েছি।

আমরা ম্যাচ শুরুর প্রায় দেড় ঘণ্টা পূর্বে মাঠে প্রবেশ করি। তখন দর্শকরা ধীরে ধীরে মাঠে প্রবেশ করছে। ম্যাচ শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টা আগে লিভারপুলের খেলোয়াড়রা মাঠে প্রবেশ করতেই উপস্থিত দর্শকরা তুমুল করতালির মাঝে তাদেরকে স্বাগত জানালো। মাঠে প্রবেশ করে খেলোয়াড়রা ওয়ার্ম আপ শুরু করলো। ম্যাচ শুরুর বিশ মিনিট আগেও গ্যালারীর প্রায় অর্ধেক আসন ফাঁকা দেখে মনে হল দর্শকে ভর্তি সেই চিরায়ত টইটম্বুর পরিবেশে বোধহয় খেলা দেখার ফ্লেভার নিতে পারব না। কিন্তু আমাদের দুজনকে অবাক করে দিয়ে ম্যাচ শুরুর পাঁচ মিনিট আগে দেখি এনফিল্ড আমাদের সেই চিরচেনা রুপে সেজে উঠেছে। পুরো মাঠ জুড়ে শুরু হয়ে গেছে লাল সেনানীদের সেই জাদুকরী গর্জন। ওয়ার্ম আপ শেষে ড্রেসিংরুমে ফিরে দুই দল মাঠে একসাথে মাঠে প্রবেশ করতেই তুমুল হর্ষধ্বনিতে পুরো স্টেডিয়াম মুখরিত হয়ে উঠলো। অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে গোল হয়ে মাঠের সবুজ গালিচার মাঝে রাখা ফুটবল সদৃশ উয়েফার পতাকা নাড়িয়ে ঢেউ তুলে চলেছে, খেলোয়াড়, স্টাফরা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো গ্যালারি উঠে দাঁড়িয়ে উয়েফার থিম সঙয়ের সাথে গলা মেলালো। গান শেষ হতেই তুমুল করতালির বৃষ্টিতে পুরো স্টেডিয়াম যেন ভিজে গেল।

রেফারির বাঁশি বাজতেই খেলা শুরু হয়ে গেল। লিভারপুল শুরুতেই আক্রমণাত্মক খেলা শুরু করলো। আমাদের গ্যালারি স্ট্যান্ডের দিকে মানে এবং ফিরমিনোর পজিশন ছিল। সালাহ ছিল অন্য প্রান্তে। অত উঁচুতে বসে খেলোয়াড়দের অবয়বটি দেখা যায় কিন্তু স্পষ্ট চেহারা দেখা যায় না। তবে পুরো মাঠ জুড়ে খেলার নান্দনিকতা চমৎকার ভাবে উপলব্ধি করা যায়। বিশেষ করে ছোট-ছোট পাসের পসরা সাজিয়ে যখন একেবারে গোলপোস্টের সামনে থেকে খেলা বিল্ডআপ করে, মাঝ মাঠ পেরিয়ে বিপক্ষ দলের অর্ধে প্রবেশ করে আছমকা গতি বাড়িয়ে ডি বক্সে ঢুকে পড়ে কিংবা ডি বক্সের সামনে থেকে বল কেড়ে নিয়ে প্রতি-আক্রমনে মুহূর্তের মধ্যে তিন চার টাচে চিতা বাঘের গতিতে দৌড়ে বিপক্ষ দলের গোল পোস্টের সামনে চলে যায় তখন পুরো মাঠের ছবিটা যে এত স্পষ্ট ভাবে ধরা দেয় সেটি ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

সাদিও মানের অসম্ভব গতি দেখে ভালো লাগলো। মানেকে ডি বক্সের সামনে অত্যন্ত সপ্রতিভ লাগলো। বিশেষত ইনসাইড আউট করে দুই তিন জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তীব্র গতিতে যেভাবে ডি বক্সে ঢুকে পড়তে দেখলাম সেটি এক কথায় অনবদ্য। মাঝে ফিরমিনোর একটা ব্যাকহিল দেখে ব্রাজিলিয়ান ঝলকের সাক্ষী হলাম। ডান প্রান্তে সালাহ সেদিন কেমন যেন নিজের ছন্দে ছিলেন না। ভ্যান ডিককে ডিফেন্সে অসাধারণ লাগলো। প্রথম হাফের মাঝের দিকে মাঝমাঠ থেকে আচমকা এক নিখুঁত পাস পেয়ে নাপোলি গোল করে লিড নিল। পুরো স্টেডিয়াম যেন শোকের সাগরে স্তব্ধ। লিভারপুলের সমর্থকদের স্ট্যান্ডগুলোতে পিন পতন নীরবতা। ওদিকে নাপোলির কয়েক হাজার সমর্থক গলা ফাটিয়ে চলেছে। পুলিশ ওদের দিকে ফিরে সবকিছুর দিকে নজর রাখছে।
গোল খাওয়ার পর শুরু হলো লিভারপুল সর্থকদের আসল খেলা। যখনই লিভারপুল বল নিয়ে নাপোলির ডি বক্সের দিকে যায় তখনই পুরো স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে গান শুরু করে, ‘ওয়ে ওয়ে লিভারপুল, উই আর দা চ্যাম্পিয়ন। মাঝে মাঝে সকলে মিলে গাইছে We never walk alone. দলের একটা ভালো মুভমেন্ট পেলেই দর্শকরা চিৎকার করে, হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। রেফারি বিপক্ষে বাঁশি বাজালে পুরো স্টেডিয়াম গর্জন করে উঠছে। সমানে গালি দিচ্ছে। আবার নাপোলির গোলকিপার বল ধরলেই পুরো স্টেডিয়াম উ উ করে শব্দ করছে। এ এক অদ্ভূত মায়াবী পরিবেশ।

৬৫ মিনিটের দিকে লিভারপুল গোল শোধ করতেই পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে যেন লাল সমুদ্রের গর্জন। এবার দর্শকরা আরো বেশি এক্টিভ। দলকে জেতানোর দায়িত্ব যেন সমর্থকদের কাঁধেই বেশি। মাঠে আপনি ততক্ষণই বসে খেলা দেখতে পারবেন যতক্ষণ বল নিজেদের অর্ধে বিপক্ষের পায়ে থাকবে। বল নিজেদের খেলোয়াড় মাঝ মাঠ পেরিয়ে বিপক্ষের ডি বক্সের দিকে এগিয়ে যেতেই পুরো স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়াবে, গান শুরু করবে, ওয়ে ওয়ে লিভারপুল, উই আর দা চ্যাম্পিয়ন। একটা বিষয় খুব ভালো লাগলো সমর্থকরা মাঠে দলের খুব ছোট ছোট বিষয়কে অনেক গুরুত্ব দেয়। কোনো খেলোয়াড় মাঠ ছেড়ে গেলে, নতুন খেলোয়াড় বদলি হয়ে মাঠে ঢুকলে পুরো স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে হাত তালি দেয়।

শেষের কয়েক মিনিট লিভারপুল অতি আক্রমণাত্মক খেলা শুরু করলে নাপোলি এক পয়েন্ট ধরে রাখার জন্য পুরো ডিফেন্সিভ মুডে চলে যায়। ওদিকে এনফিল্ডের পুরো দর্শক তখন উঠে দাঁড়িয়ে দলকে উজ্জীবিত করে পুরো তিন পয়েন্ট ছিনিয়ে নেয়ার জন্য তাদের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে গলায় সুর তুলেছে। সে এক অদ্ভুত শিহরণ। এভাবে দর্শকদের আবেগ-উত্তেজনাকে সাথে নিয়ে ৯০ মিনিটের ফুটবল মহারণের পুরোটা সময় কখন যে টিকটিক করে চলতে থাকা ঘড়ির পীঠে সাওয়ার হয়ে চলে গেছে বুঝতে পারিনি। বুঝবো কি করে ফুটবল নামক এক মহা মন্ত্রের মাদকতায় যে মোহাছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। আনন্দ-বেদনার মহাকাব্যের সাক্ষী হয়ে বুঝেছিলাম, ফুটবল আসলেই জীবনের জলছবি। যেখানে সুখ আছে-দুঃখ আছে, হাসি আছে-আনন্দ আছে, উত্থান আছে-পতন আছে। আর আছে ফুটবলের পরম্পরাকে এগিয়ে নিতে সদা প্রস্তুত একদল পাগলাটে সমর্থক। এরকম পাগলাটে ফুটবল অন্তঃপ্রাণ সমর্থক আছে বলেই ফুটবল খেলার এত প্রাণশক্তি, এত প্রাচুর্য।
জয়তু ফুটবল, জয়তু ফুটবল সমর্থক!

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অনুসরণ করুন

Covid 19

20 Jan 2021, 4:12 AM (GMT)

Bangladesh Stats

529,031 Total Cases
7,942 Death Cases
473,855 Recovered Cases