Select Page

ইত্তিহাদে গারদিওলা দর্শন

ইত্তিহাদে গারদিওলা দর্শন

“Some are born here; some are drawn here but we call it home.”

ম্যানচেস্টার সিটির নতুন ঠিকানা ইত্তিহাদ স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের বসার জায়গায় ঠিক ওপরে নীলছে আভায় গোলাকৃতি ফুটবল সদৃশ দেয়ালে সাদা অক্ষরের পুথিমালায় Tony Walsh’s এর বিখ্যাত কবিতা ‘Longfella’ এর আবেগঘন চরণটি ক্লাবের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের ছবিখানি সযত্নে ধারণ করে চলেছে। ২০১৭ সালের ২২ মে ম্যানচেস্টার শহরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত ২২ জনের স্মরণে কবি Tony Walsh’s এই কবিতাখানি লিখেছিলেন। ইত্তিহাদের ভেতরে টানেল পেরিয়ে খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুমের প্রবেশপথে দেয়ালজুড়ে খোদাই করা পুরো কবিতাখানি উজ্জ্বল অক্ষরে নিহতদের স্মৃতির তর্পণে আলো জ্বালিয়ে চলেছে। আর তাই ম্যান সিটির সমর্থকদের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি ফুটবল ক্লাব নয়, এটি তাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি । প্রত্যেক ফুটবল পাগল সিটি সমর্থকের সুখ-দুঃখের নিবাস। যে নিবাস থেকে অনেকেই বিদায় নিয়েছেন, অনেকেই বর্তমানে অবগাহন করছেন, আবার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সযত্নে আগলে রেখেছেন। সাফল্য- ব্যর্থতা যাই আসুক না কেন, এটি যে তাদের একান্তই নিজস্ব আনন্দধাম। যে ধাম প্রতি মুহূর্তে জীবনের জয়গান গেয়ে চলেছে।

১৮৯৪ সালে ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাবের গোড়াপত্তন। অনেক চড়াই-উৎরায় পেরিয়ে এগিয়ে চলা ক্লাবটি এই একুশ শতকের শুরুতেও বলতে গেলে একেবারে দেনার দায়ে ডুবে ছিল। ২০০৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুটবল পাগল ধনকুবের শেখ মনসুর ম্যানচেস্টার সিটির বেশিরভাগ শেয়ার কিনে অঢেল বিনিয়োগ করে ক্লাবের পুরো পরিকাঠামো ঢেলে সাজানো শুরু করেন। প্রথম তিন বছর সেভাবে সফলতার মুখ না দেখলেও ২০১১-১২ মৌসুমে ম্যান সিটি পুরো সিজন হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর শেষ ম্যাচে ইনজুরি টাইমে একেবারে শেষ মুহূর্তের গোলে দীর্ঘ ৪৪ বছর পর সমর্থকদের মুখে হাসি ফোঁটায়। এরপর ২০১৬ সালে বায়ার্ন মিউনিখ থেকে পেপ গারদিওলাকে ম্যানেজার হিসেবে উড়িয়ে আনার পর থেকে ম্যান সিটি ক্লাব ফুটবলের বনেদি পরিবারের সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ক্লাবের মালিকানা বদলের পর ম্যান সিটি তাদের ঠিকানাও বদল করে ফেলেছে। তাদের বর্তমান নিবাস ভূমির নাম ইত্তিহাদ স্টেডিয়াম। তবে স্টেডিয়ামকে ঘিরে গড়ে ওঠা ক্লাবের যাবতীয় পরিকাঠামোকে একসাথে বোঝাতে বলা হয় ‘ইত্তিহাদ ক্যাম্পাস’। নিজস্ব ঢঙে গড়ে তোলা অত্যাধুনিক এই ক্যাম্পাসে ফুটবল নামক এক মায়াবী মনোহর জাদুর জগতের দেখা মেলে।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার চমৎকার মিশেলে গড়ে ওঠা ফুটবল মহানগরী ম্যানচেস্টার। ম্যানচেস্টার শহরের মাঝে অবস্থিত সবচেয়ে বড় ট্রাম স্টেশন Piccadily থেকে কয়েক মাইল ব্যাসার্ধের মাঝে পৃথিবী বিখ্যাত দুটো বড় ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটি শহরটাকে পৃথিবীর তাবৎ ফুটবল প্রেমীদের কাছে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ম্যানচেস্টার শহরের মোট লোকসংখ্যা ৫ লক্ষ ৩৮ হাজারের মত। ভাবুনতো কোন এক সুপার সানডের কথা। দুই ক্লাবেই সন্ধ্যাবেলা দুটো বড় ম্যাচ চলছে। ম্যান ইউয়ের মাঠে রেড ডেভিলদের হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন ৮৮ হাজার লাল সমর্থক, ওদিকে সিটিজেনদের হয়ে গলা ফাটিয়ে চলেছন ৫৫ হাজার নীল জার্সিধারী। সব মিলিয়ে ঐ ৯০ মিনিটে শহরের ৫ লক্ষ ৩৮ হাজার মানুষের মধ্যে ১ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ ফুটবল মাঠে গলা ফাটিয়ে চলেছেন তাদের নিজের দলের হয়ে। অন্যদিকে মাঠের বাইরে ফ্যান পার্ক, পাব, বার মিলিয়ে আরো লক্ষাধিক মানুষ ফুটবল আনন্দযজ্ঞে সামিল হয়েছেন। সব মিলিয়ে একটা শহরের অর্ধেক মানুষ মাঠে এবং মাঠের বাইরে ফুটবল উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে আছেন, যা এক কথায় অবিশ্বাস্য।

যাই হোক Piccadily থেকে সাড়ে তিন পাউন্ড দিয়ে ডে টিকিট কেটে ইত্তিহাদ ক্যাম্পাসের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। সিটি সেন্টার পেরিয়ে কয়েক মিনিটের যাত্রা শেষে ইত্তিহাদ ক্যাম্পাসে এসে ট্রাম থামল। যাত্রাপথে আধুনিক কিছু স্থাপনার পাশাপাশি পুরাতন স্থাপনা চোখে পড়লো, যেগুলো সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখা আছে। ইংল্যান্ডে আসার পর এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অবাক করে আমাকে। সেটি হল ঐতিহ্যকে পরম মমতায় সংরক্ষণ করা। এদের প্রত্যেকটা শহরে দুই-তিনটে করে মিউজিয়াম পাবেন, যেখানে শহরের পুরাতন ঐতিহ্য গুলোকে সযত্নে রাখা আছে। আপনি একটি পুরাতন বাড়ি ভাঙতে গেলে আপনাকে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের অনুমতি নিতে হবে, ওরা ঐ বাড়িটির কোন ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে কিনা সেটি যাচাইয়ের পর অনুমতি দিলে তারপর আপনি বাড়ি ভাঙার অনুমতি পাবেন।

ট্রাম থেকে নামতেই দুই ডিগ্রী তাপমাত্রার রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া ইত্তিহাদ ক্যাম্পাসে স্বাগত জানালো। ট্রাম স্টেশন থেকে চমৎকার বাঁধানো সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে ওপরে উঠতেই অনিন্দ্য সুন্দর ক্যাম্পাসের প্রবেশ মুখে রাখা ফুটবল সদৃশ ছাতার নীচে আয়তাকার নীল অভিবাদন বোর্ডের দিকে তাকাতেই আপনি দেখতে পাবেন WELCOME TO MANCHESTER CITY। প্রবেশ মুখের কাছেই আছে চমৎকার ফুটবল সুপারমল। এখানে ক্লাবের জার্সি, ফুটবল, টুপি, মাফলার, বই, ম্যাগাজিনসহ ক্লাবের যাবতীয় কিটস সাজিয়ে রাখা আছে বিক্রির জন্য। মলের এক কোনায় ক্লাবের জেতা সর্বশেষ ট্রফিগুলো প্রদর্শনীর জন্য রাখা আছে। ১০ পাউন্ড দিলে ওরা ট্রফির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে দিবে এবং কয়েক মিনিট পর আপনি প্রিন্টেড কপি পেয়ে যাবেন।
২০ পাউন্ড (স্টুডেন্ট ২০ পাউন্ড, অন্যদের ২৭ পাউন্ড) দিয়ে টিকিট কেটে এবার Guided Tour এর জন্য অপেক্ষা। সুপারমলের গেট পেরিয়ে সামনে যেতেই পুরো ঘর জুড়ে ক্লাবের সুভেনির সাজানো। সেই ক্লাব সৃষ্টির পর থেকে ক্লাবের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো সযত্নে সাজিয়ে রাখা। আমরা গ্রুপে প্রায় ৩০ জন মত ছিলাম। প্রত্যেকের হাতে একটি করে ডিভাইস এবং ইয়ার ফোন দেয়া হল। দুইজন ট্যুর অপারেটর আমাদেরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রী রুমে নিয়ে গেল। রুমে ঢুকে ডিভাইস অন করে এয়ার ফোন অন করতেই কর্ণ কুহরে ভেসে এল সমর্থকদের সেই চিরচেনা গমগমে আওয়াজ, অন্যদিকে দেয়ালে চোখ রাখতেই ৩৬০ ডিগ্রীর পর্দায় ভেসে ওঠা দৃশ্যপট আমাদেরকে টাইম মেশিনে করে নিয়ে গেল ম্যান সিটির ইতিহাসের কানাগলিতে। কয়েক মিনিটের অডিও ভিজুয়ালের ভেলায় চড়ে আমরা ম্যান সিটির অতীত ও বর্তমানের গৌরব গাঁথার সাক্ষী হলাম। ইতিহাসের গোলক ধাঁধা পেরিয়ে এবার আমরা চলে গেলাম ইত্তিহাদ ক্যাম্পাসের ফ্যান পার্কে। ম্যাচ ডে তে ফ্যান পার্কের উন্মাদনা অনুভব করতে আমাদের গাইড ইয়ার ফোন অন করতে বলল। ইয়ার ফোন অন করতেই কানে ভেসে এল সেই চিরচেনা গমগমে আওয়াজ, সমবেত ফুটবল সঙ্গীতের সুরধুনী। ইয়ার ফোনে সিটিজেনদের ভালবাসার আবেগের ভেলায় চড়ে ফ্যান পার্ক পেরিয়ে চলে গেলাম ইত্তিহাদ স্টেডিয়ামের প্রবেশমুখে।

ইত্তিহাদ স্টেডিয়ামের মূল ফটকের সামনের দিকটা খুব পরিপাটি করে সাজানো। চারিদিকে নীলের আভা, তার মাঝে দেয়ালজুড়ে ম্যানসিটির খেলোয়াড়দের বিজয়গাঁথার ছবি টাঙানো। ম্যাচের দিন স্বাগতিক দলের খেলোয়াড় বহনকারী বাস এসে মূল ফটকের সামনের ফাঁকা জায়গায় পার্ক করে। সমর্থকরা মাঝখানে খেলোয়াড়দের জন্য তৈরি নিরাপত্তা বেষ্টনীর দুই পাশে তাদের ভালবাসার বরণডালা নিয়ে হাজির হয়। প্রবল হর্ষধ্বনির সাথে তুমুল করতালির বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে, সমর্থকদের সাথে হাত মেলাতে মেলাতে খেলোয়াড়রা ড্রেসিংরুমের দিকে যাত্রা শুরু করে। অন্যদিকে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের সুড়ঙ্গপথ দিয়ে ড্রেসিংরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানেও সেই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। স্বাগতিক দল সমর্থকদের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে মাঠে প্রবেশ করে, আর বিপক্ষ দল সুড়ঙ্গ পথ ধরে যেন এক অচিনপুরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

ইত্তিহাদের প্রবেশমুখ পেরোতেই চমৎকার ভাবে গোছানো পরিপাটি অভ্যর্থনা কক্ষ। এই কক্ষ পেরিয়ে কিছুটা সামনে যেতেই পরপর দুটো ড্রেসিংরুম। ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথে একটি বাঁকের সামনে ম্যানচেস্টারে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে কবি Tony Walsh’s এর বিখ্যাত কবিতা ‘Longfella’ বাঁধাই করে রাখা আছে, যার পংক্তিমালা শোককে শক্তিতে পরিনত করতে সহায়তা করে।
This is the place
In the north-west of England. It’s ace, it’s the best
And the songs that we sing from the stands, from our bands
Set the whole planet shaking.
Our inventions are legends. There’s nowt we can’t make, and so we make brilliant music
We make brilliant bands
We make goals that make souls leap from seats in the stands
………………
But the Manchester way is to make it yourself.
And make us a record, a new number one
And make us a brew while you’re up, love, go on
And make us feel proud that you’re winning the league
And make us sing louder and make us believe that this is the place that has helped shape the world
……………………
And this is the place where we first played as kids. And me mum, lived and died here, she loved it, she did.
And we fund local kids, and we fund local teams. We support local dreamers to work for their dreams. We support local groups and the great work they do. So can you help us. help local people like you?
Because this is the place in our hearts, in our homes, because this is the place that’s a part of our bones.
Because Greater Manchester gives us such strength from the fact that this is the place, we should give something back.
Always remember, never forget, forever Manchester.

ড্রেসিংরুমে প্রবেশের পূর্বেই সাজানো-গোছানো পরিপাটি এক জিমের দেখা মেলে। ম্যাচ শুরুর পূর্বে অথবা ম্যাচের মধ্য বিরতিতে খেলোয়াড়রা এখানে হালকা জিম করে নিতে পারে। ম্যাচের মধ্য বিরতিতে জিমের তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রিতে রাখা হয়, যাতে করে খেলোয়াড়রা শরীরের ঘাম দ্রুত শুকিয়ে ফ্রেশ হতে পারে। জিমের চারপাশের দেয়াল জুড়ে খেলোয়াড়দের বিজয়ল্লাসের মুহূর্তগুলো চমৎকার ভাবে বাঁধিয়ে রাখা। এটাও মনস্তাত্ত্বিক খেলার অংশ। পেপ গারদিওলার ভাষায় Extra 1% psychological impact. জিমে বসে খেলোয়াড়রা যেদিকে তাকাবে সেদিকেই তাদের গর্বিত বিজয়ী মুহূর্তগুলিকে অনুভব করতে পারবে, যেটি তাদের মননে নেতিবাচক ভাবনাকে দূরে সরিয়ে বিজয়ের ইতিবাচক আকাঙ্খাকে প্রজ্বলিত করে।

জিম পেরিয়ে প্রথমে বিপক্ষ দলের ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করলাম, যেটি সাদামাঠা মনে হল। এরপর আমাদের গাইড ম্যান সিটির ড্রেসিংরুমে নিয়ে গেল, যার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে পেপ গারদিওলার ফুটবল রুচির মিষ্টি আভা। দরজা পেরিয়ে গোলাকৃতির ড্রেসিংরুমে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়বে গারদিওলার Strategic Display Board, বোর্ডের গায়ে লেপটে থাকা চুম্বকীয় গুটি যেটি মুভ করে খেলার আগে এবং মধ্য বিরতিতে খেলোয়াড়দের কৌশল বুঝিয়ে দেয়া হয়। বোর্ডের ঠিক ওপরেই বড় আকারের টিভি স্ক্রিন, যেখানে প্রয়োজনীয় ফুটেজগুলো দেখানো হয়। ড্রেসিংরুমে গারদিওলার একটি হাসিমুখের কাট আউট রাখা আছে। খেলোয়াড়দের চেয়ারগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো। চেয়ারের ওপর প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নাম ও নম্বর নামাঙ্কিত জার্সি ঝুলছে। চেয়ারের সাথে পেছনে একটি করে ড্রয়ার, যেখানে খেলোয়াড়রা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখতে পারে। ড্রয়ারের দরজায় যেন এক জন আরেকজেনর সাথে আড়াল না হয়ে যায় তার জন্য ড্রয়ারের দরজা ভেতরে প্লেস করার ব্যবস্থা আছে। ড্রেসিংরুম জুড়েও নীলের ছোঁয়া এবং ড্রেসিংরুম গোলাকৃতির শেইপে আনার কারণ হল, কোচ যখন কথা বলবেন, তখন যেন সবার সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা।

ক্লাবে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড় থাকে, সবাই ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে উঠে আসা। ফলে তাদের মধ্যে যেন ভালো পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে ওঠে সেজন্য একই দেশের খেলোয়াড়দের সাধারনত পাশাপাশি চেয়ারে বসতে দেয়া হয় না। একটাই ব্যতিক্রম চোখে পড়লো আর্জেন্টিনার দুই খেলোয়াড় সারজিও আগুয়েরো এবং ওটোমেণ্ডির চেয়ার দুটো পাশাপাশি চোখে পড়লো। সুযোগ পেয়ে গাব্রিয়েল জেজুস এবং সারজিও আগুয়েরোর চেয়ারে বসে একটু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফ্লেভার নিলাম। আমাদের দেশে এই দুই দল এবং দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে কি উন্মাদনা, কতটা শত্রু শত্রু ভাব। আমরা এক দলের সমর্থকরা অন্য দলের খেলোয়াড়দের ভালো চোখে দেখি না। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মানুষের মাঝেও সেই ঝাঁজ আছে ফলে এই দুই দলের মাঝে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস রয়েছে। অথচ জাতীয় দলের বাইরে ক্লাব ফুটবলে এই দুই দেশের ফুটবলারদের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি এবং ক্লাবের হয়ে এই দুই দেশের খেলোয়াড়রা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছে এবং তাদের মধ্যে অদ্ভুত রসায়ন গড়ে উঠছে। রোনালদিনহো-মেসি, মেসি-নেইমার, আগুয়েরো-জেজুস তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জেজুসের চেয়ারে বসে আছি, এমনসময় গাইড ড্রেসিংরুমের টিভি অন করলো। ম্যাচের আগে এবং ম্যাচের মধ্য বিরতিতে গারদিওলা কিভাবে খেলোয়াড়দের তার কৌশল বুঝিয়ে দেন, মানসিক ভাবে উজ্জীবিত করেন তার একটি অডিও-ভিজুয়াল দেখানো হল। যেখানে গারদিওলা আক্রমণাত্মক শরীরী ভাষায় উত্তেজিত ভঙ্গিতে খেলোয়াড়দের বলছেন, ‘You always keep in mind, I am the boss!’

খেলা শুরুর আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সেরে ড্রেসিংরুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দুই দল এক জায়গায় মিলিত হয়। এই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় খেয়াল করলাম, দেয়ালের দুই পাশে ম্যান সিটির প্রত্যেক খেলোয়াড়ের প্রিয়জনের হাস্যজ্বল ছবি টাঙানো আছে। কারো মা, কারো প্রিয়তমা আবার কারো সন্তানের প্রিয় মুখ সেখানে আল ছড়িয়ে চলেছে। এটাও পেপের নিজস্ব ফুটবল দর্শনের অংশ। সেই Extra 1% psychological impact. অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে নামার পূর্বে প্রিয় মানুষের প্রতিচ্ছবি তাদের মনে এক প্রকার ইতিবাচক উদ্দিপনার জন্ম দেয়, যেটি মানসিক চাপ কমিয়ে মাঠে নেমে শতভাগ উজাড় করে দিতে সহায়তা করে।

সিঁড়ির কোনায় গারদিওলার অফিস কক্ষ। গারদিওলার দুটো অফিস আছে, একটি একাডেমীতে আরেকটি স্টেডিয়ামে। স্টেডিয়ামের অফিস কক্ষে গারদিওলার গুরু বার্সেলোনার সাবেক সফল কোচ, লা মেসিয়ার উদ্ভাবক ইউহান ক্রুয়েফের ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন। যার ফুটবল দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে গারদিওলা তিকিতাকার পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন এবং বার্সেলোনাতে মেসি-ইনিয়েস্তা-জাভি-আলভেজদের পায়ে অন্য গ্রহের জাদুর ফুটবলের পসরা সাজিয়ে ফুটবল প্রেমীদের হৃদয়-মন জয় করেছিলেন। রুমে টেবিল ভর্তি বিয়ার-ওয়াইনের বোতল। খেলা শেষে বিপক্ষ দলের ম্যানেজারকে নিজের অফিস কক্ষে নিমন্ত্রণ করে একসাথে গলা ভেজান এবং ঐ সময়টুকু কৌশল, প্রতিদ্বন্দ্বিতার আঁচ ভুলে নিখাদ ফুটবল আড্ডায় মেতে ওঠেন।

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই আমাদের গাইড দর্শনার্থীদের দুই সারিতে ভাগ হয়ে দাঁড়াতে বললেন, ঠিক যেভাবে ম্যাচ শুরুর পূর্বে দুই দলের খেলোয়াড়রা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ায়। আমি সিটি ফ্যান হিসেবে পরিচয় দেয়াতে গাইড আমাকে সিটির অধিনায়ক হিসেবে সবার সামনে বাম পাশের সারিতে দাঁড়াতে বলল। আমার ডান পাশে বিপক্ষ দলের অধিনায়ক। ম্যাচ ডের মত নিয়ম করে আমাদের দুই অধিনায়ককে হাত মেলাতে বলল। আমি হাসি মুখে হাত মেলাতেই গাইড বলল, হাসিমুখ থাকলে চলবে না, দুজনের চেহারায় একটা শত্রু শত্রু ভাব আনতে হবে যাতে করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আঁচ পাওয়া যায়। অগত্যা গম্ভীর মুখে হাত মেলালাম। এবার আমাদের কাছে থাকা ডিভাইস অন করে ইয়ায় ফোন কানে দিতে বলল, যেন আমরা ম্যাচের দিন খেলোয়াড়রা মাঠে নামার পূর্ব মুহূর্তের সেই গমগমে আওয়াজের সাক্ষী হতে পারি।

টানেলের দামী কার্পেটের ওপর দিয়ে আমরা সারিবদ্ধ ভাবে হেঁটে চলেছি, সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আমি যেন ম্যান সিটি অধিনায়ক ভিনসেন্ট কোম্পানি, আর আমার পেছনে সারিবদ্ধ ভাবে এগিয়ে আসছে সারজিও আগুয়েরো, গাব্রিয়েল জেজুস, কেভিন ডি ব্রুইনা, ওটোমেণ্ডি, রাহিম স্টারলিং, ডেভিড সিলভা প্রমুখ আর গাইড হিসেবে আমার সাথে আছেন খোদ গারদিওলা! কর্ণ কুহরে বেজে চলেছে ইংলিশ দর্শকদের সেই গমগমে আওয়ায়জের প্রতিধ্বনি, যা সত্যিকারের ম্যাচের দিনের অনুভূতি এনে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে ইত্তিহাদের ৫৫ হাজার ক্রেজি ফুটবল ফ্যান নেচে-গেয়ে তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে ৯০ মিনিটের জন্য আমাদেরকে ১২০×৮০ গজের সবুজ গালিচায় অভ্যর্থনা জানাতে ভালবাসার বরণডালা সাজিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে।

করিডোর পেরিয়ে কর্ণ কুহরে ভেসে আসা তুমুল করাতলির বৃষ্টিতে সিক্ত হয়ে ইত্তিহাদের সবুজ গালিচার সামনে গিয়ে হাজির হলাম। সে এক অনির্বচনীয় অনুভূতি, ভাষার দীনতা সেই অনুভূতি প্রকাশে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠে প্রবেশ করতেই মনে হল যেন নীল সমুদ্রে অবগাহন করার জন্য সেই ৬ হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশ থেকে ম্যানচেস্টারে হাজির হয়েছি। গ্যালারীর প্রত্যেকটি চেয়ার থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের প্রতি পরতে পরতে লেগে আছে নীলের ছোঁয়া। ফুটবল পিচের দিকে চোখ ফেরাতেই মনে হল, বিস্তীর্ণ নীল প্রান্তরের মাঝে যেন এক টুকরো আয়তাকার সবুজ দ্বীপ। যে দ্বীপ ফুটবল নামক এক জাদুর গোলকের ছোঁয়ায় প্রতিটি মুহূর্ত রাঙিয়ে দিয়ে জীবনের জয়গান গাইতে সদা উন্মুখ হয়ে চেয়ে আছে।

উজ্জ্বল সবুজ গালিচা দেখে এতদিন ভাবতাম এটি বোধহয় কৃত্রিম ঘাসের তৈরি। কিন্তু সাথে থাকা গাইডকে জিজ্ঞেস করতেই এত দিনের প্রচলিত ভুল ভাঙল। গাইড জানালো এই মাঠ তৈরিতে ৯৭ ভাগ প্রাকৃতিক ঘাস এবং ৩ ভাগ কৃত্রিম ঘাস ব্যবহার করা হয়েছে। বেলজিয়ামে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ৯৭ ভাগ প্রাকৃতিক ঘাসের মাঝে ৩ ভাগ কৃত্রিম ঘাস এমন ভাবে মিশিয়ে দেয়া হয় যেন ঘাসগুলো সবসময় খাঁড়া থাকে এবং নুইয়ে না পড়ে। মাঠে দেখলাম দুটো অতি বড় আকৃতির কৃত্রিম বাল্ব সূর্যের মত আলো ছড়িয়ে চলেছে। এত বড় বাল্ব আগে কখনো দেখিনি। খোঁজ নিতে জানা গেল, ইংল্যান্ডের আবহাওয়া সাধারণত রৌদ্রোজ্জ্বল না। সারাক্ষণ মেঘলা আকাশ এবং বৃষ্টি লেগে থাকে, তাই ঘাসগুলোকে সজীব ও সতেজ রাখতেই এই কৃত্রিম সূর্যালোকের ব্যবস্থা। মাঠের এক কোনায় দেখলাম গোলপোস্ট পড়ে আছে, ম্যাচ শুরুর আগে ওরা গোলপোস্ট নির্ধারিত জায়গায় স্থাপন করে। ডাগ আউটে সাপোর্ট স্টাফদের চেয়ারগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো। সুযোগ বুঝে গারদিওলার চেয়ারে বসে একটা ছবি তুললাম।

ইত্তিহাদের ভিআইপি বক্স একটু আলাদা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাঠে কাঁচ ঘেরা ভিআইপি বক্স কিন্তু এখানে মূল গ্যালারীর সাথেই তবে বাড়তি সুবিধা হল ভিআইপি বক্স এরিয়াতে হিটিং সিস্টেম ছালু আছে। ফলে টাকাওয়ালা মানুষগুলো তীব্র শীতের মাঝেও উষ্ণ আবহাওয়ায় খুব আরামে বসে ক্লাব ফুটবলের উত্তাপ উপভোগ করতে পারেন। স্টেডিয়ামের ভেতরটা দেখানোর পর আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হল ইত্তিহাদের পানশালায়। যেখানে ম্যাচের বিরতিতে ইচ্ছেমত গলা ভেজানোর ব্যবস্থা আছে। ইত্তিহাদের পানশালা খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুমের ঠিক নীচের তলায় অবস্থিত। পানশালা পেরিয়ে গাইড আমাদেরকে মিডিয়া জোনে নিয়ে গেল যেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচারের যাবতীয় কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করে। মিডিয়া জোন পেরিয়ে মিক্সড জোন। যেখানে খেলার পর কোচরা বসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। মিক্সড জোনে ঢুকতেই গাইড আমাকে তার পাশে দাঁড়াতে বলল। বাকি সবাইকে সাংবাদিকদের চেয়ারে বসতে বলল। এরপর গাইড আমাকে ওপরের ডেস্কে থাকা মাঝের চেয়ারের পাশেরটাতে বসতে বলল। সেই মুহূর্তে আমি আসলে কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এরপর সাথে থাকা আরেকজন গাইড এসে আমাকে বলল, তোমাকে প্রশ্ন করা হবে একজন সিটি ফ্যান হিসেবে তুমি গারদিওলার কাছে কোন জিনিসটি আশা কর। আমি বললাম ওকে আমি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব। এরপর সে বলল, তোমার মোবাইলের ভিডিও রেকর্ডার অন করে দাও। আমি তখনো বুঝতে পারছি না কি হতে চলেছে।

এরপর শুরু হল প্রযুক্তির খেলা। মিক্সড জোনের টিভি স্ক্রিন অন করতেই দেখি গারদিওলা টিভিতে আমার পাশের চেয়ারে বসে মিটিমিটি হাসছেন! প্রথমে প্রযুক্তির গোলক ধাঁধায় একটু এলোমেলো হয়ে নিজেকে সামলে নেই। এরপর দেখি আমাদের গাইড গারদিওলাকে প্রশ্ন করছে আর গারদিওলা উত্তর দিচ্ছেন। প্রযুক্তির পরশে সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল একেবারে চোখের সামনে একেবারেই বাস্তব সাংবাদিক সম্মেলন চলছে। এবার আসলো আমার পালা। গারদিওলাকে গাইড জিজ্ঞেস করলো, What do you think about the supporter’s demand? তখন গারদিওলা উত্তর দিল, It’s better to know from the supporters what they want to get from me? তখন আমি বললাম, I want to see the replication of beautiful football produced by Gurdiola in Barcelona, and as a city supporter I want to win champions league in this season. আমার কথা শুনে গারদিওলা দেখি মিটিমিটি হাসছেন। এরপর গারদিওলা টিভি থেকে আমাদেরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় নিলেন। সত্যি বলতে কি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কয়েক মিনিট সময় যেন আমার কাছে থমকে গিয়েছিল। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম গারদিওলার সাথে।

সাংবাদিক সম্মেলন শেষ হওয়ায় পর আমাদেরকে আবার সেই ৩৬০ ডিগ্রী রুমে নিয়ে গিয়ে আবার ডিভাইস অন করে ইয়ার ফোন কানে দিতে বলল। এবার দেখানো হল ম্যান সিটি ক্লাবের আগামী ২৫ বছরের পরিকল্পনা। এই মুহূর্তে ইত্তিহাদের দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৫৫ হাজার। ওরা আগামী দুই বছরের মধ্যে এটি ৬৫ হাজারে নিয়ে যাবে। কারণ ওদের পরবর্তী লক্ষ্য চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনাল আয়োজন করা। দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৬০ হাজারের নীচে হলে উয়েফা ফাইনাল আয়োজনের জন্য ক্লাবকে বিড করতে দেয় না। এছাড়া সিটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কিভাবে শিশুদের পড়ালেখা এবং ফুটবল খেলায় সাহায্য করছে সেটি দেখাল। ওদের ফুটবল একাডেমী কিভাবে চলছে এবং কিভাবে এটি আরো সমৃদ্ধ করবে তার একটি রূপরেখা আমাদের সামনে হাজির করলো। সব মিলিয়ে কিভাবে ম্যানচেস্টার সিটি তাদের ক্লাবের ভবিষ্যতকে আর সমৃদ্ধ করবে তার বিস্তারিত রূপরেখা দেখানোর পর ৩৬০ ডিগ্রী রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। এরপর গাইড আমাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে কাছে থাকা ডিভাইস ফেরত নিল এবং আমাদেরকে ইয়ার ফোন উপহার হিসেবে দিল।

এভাবে ইত্তিহাদের ইতিহাস এবং বর্তমানের কানাগলিতে বিচরণ করে দুটো ঘণ্টা কিভাবে যে কেটে গেছে বুঝতে পারিনি। ইত্তিহাদের ক্যাম্পাস থেকে অসম্ভব সুন্দর সজীব স্মৃতি সঞ্চয় করে আবার ট্রামে চড়ে বসলাম। এবার গন্তব্য Old Trafford, ফুটবল মহানগরীর আরেক অভিজাত এলাকা। উদ্দেশ্য ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাঠে বসে রেড ডেভিলডের হয়ে ইউরোপা লীগের ম্যাচে গলা ফাটানো। একজন ফুটবল প্রেমী হিসেবে এ যেন এক স্বপ্নের জগত থেকে আরেক স্বপ্নের জগতে ভেসে চলা!

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অনুসরণ করুন

Covid 19

20 Jan 2021, 2:23 AM (GMT)

Bangladesh Stats

529,031 Total Cases
7,942 Death Cases
473,855 Recovered Cases